mb

ইমাম আমার ধর্মীয় অভিভাবক

646

এড. নিয়ামুল হক: ‘ইমাম’ শব্দের আরবী অর্থ নেতা বা Leader। ইংরেজি একটি প্রবাদ বাক্যে নেতা সম্পর্কে বলা হয়েছে, He is the Leader, Who knows the way, who Go’s the way and who show’s the way. অর্থাৎ ‘যিনি সঠিক পথ সম্পর্কে জানেন, সেই পথে চলেন এবং মানুষকে পথ দেখান তিনিই নেতা।’ অর্থাৎ নেতাকে জানতে হবে জীবন চলার সঠিক পথ সম্পর্কে; শুধু জানলেই হবে না অনুসরণের মাধ্যমে তিনি অনুসারীদেরকে সেই সঠিক পথে পরিচালিত করবেন।
যে কোন ব্যাক্তিকে ইমাম হিসেবে পরিগণিত করার কোন সুযোগ ইসলামে গ্রহন করেনা। দ্বীনী বা ধর্মীয় কাজে ইমামতির জন্য নির্দিষ্ট যোগ্যতা ও গুণাবলী অর্জিত না হলে তাকে ইমাম হিসেবে ইসলাম স্বীকৃতি দেয় না। একজন ইমামের যে সকল গুণাবলী বা যোগ্যতা থাকা আবশ্যক সে সম্পর্কে ইসলামে পরিস্কার দিক নির্দেশনা দেওয়া আছে।
পবিত্র কোরআনের সূরা বাকারা-এর আয়াত-১১২, সূরা মুমিনিন-এর আয়াত-০১, সূরা আহযাব-এর আয়াত-২২ তে একজন ইমামের যোগ্যতা সম্পর্কে বলা হয়েছে। সে অনুযায়ী পর্যায়ক্রমে একজন ইমামের যে সকল যোগ্যতা থাকা আবশ্যক তা হলো (১) মুসলমান হওয়া; (২) আলেম হওয়া; অর্থাৎ দ্বীনী ইল্ম বা শরিয়াতের পরিপূর্ণ জ্ঞান থাকতে হবে (৩) বালিগ হওয়া (৪) সুস্থ্য ও স্বাভাবিক হওয়া (৫) পুরুষ হওয়া; (৬) স্বাধীন হওয়া (৭) বিভিন্ন প্রকার ওযর ও অসুবিধামুক্ত হওয়া। এসকল যোগ্যতা থাকলে একজন ব্যক্তি মসজিদের ইমাম হতে পারবেন।
বাংলাদেশ একটি মুসলিম সংখ্যাগরিষ্ট দেশ, আর ইসলাম আমাদের ধর্ম। আমরা যারা ধর্মীয় শিক্ষা প্রতিষ্টানে পড়ালেখা করিনি তারা ইসলাম সম্পর্কে মসজিদের ইমামের নিকট হতে শিক্ষাগ্রহন করে থাকি, অথাৎ বলা যেতে পারে তিনি আমাদের সমাজের একজন ধর্মীয় অভিভাবক।
বলা বাহুল্য যে, আজকের সমাজে যখন নানা ধরনের অনাচার, অবিচার, জুলুম, নির্যাতনসহ নানা অনাচার বিরাজ করছে ঠিক তখন, ইমামগণ মসজিদে খুৎবার পাশাপাশি সকল প্রকার আলোচনা ও মাহফিলে এসব বিষয় সম্পর্কে ইসলামের দৃষ্টিভঙ্গি তুলে ধরার প্রবনতা খুবই কম লক্ষ্য করা গেছে। আমরা যখন শুক্রবারে জুম্মার নামাজ পড়তে যাই তখন দেখতে পাই অধিকাংশ ইমামগন আজ থেকে ৫০০ বা ১০০০ বছর আগের কোন ঘটনাকে মোখরোচক করার চেষ্টান এবং বক্তব্য দেন, বতমানে প্রেক্ষাপটে নানা অনাচার এর বিষয়ে কোন বক্তব্য প্রদান করেন না তারা। অথচ একটি সমাজের ধর্মীয় নেতা বা অভিভাবক তিনি। তাহার দায়িত্ব হল ইসলামের দৃষ্টিতে বক্তব্য প্রদানের মাধ্যমে সমাজ তথা জাতিকে সচেতন করে তোলার মাধ্যমে দেশে শান্তি প্রতিষ্ঠা করা।
কেন ইমামদের এমন স্বভাব: অনেক ইমাম সাহেবদের সহিত আলোচনা করে জানা যায়, তারা বলেন অপ্রিয় হলেও সত্য যে, তারা বলেন যে, ইমামরা মসজিদ কমিটির নিকট জিম্মি। প্রায় সব মসজিদের খতিব, ইমাম, মুয়াজ্জিন ও খাদেমরা সেবা করে যাচ্ছেন অল্প বেতনে। নির্দিষ্ট বেতন কাঠামো থাকা সত্ত্বেও কার্যকর হচ্ছে না সে বেতন। জুমার খুতবার বিষয়টিও মসজিদ কমিটি নির্ধারণ করে দেন। সুদ, ঘুষ, ব্যভিচার সমাজে যেসব ঘটনা ঘটছে তা কীভাবে আলোচনা করবেন সে বিষয়ে চিন্তা করতে হয়। পরহেজগার ব্যক্তিদের কমিটিতে স্থান না দিয়ে টাকার জন্য মসজিদ কমিটিতে গুরুত্বপূর্ণ পদে রাখা হচ্ছে এলাকার মাতবরদের। সুদের টাকা দিয়ে হজ করে এসে হচ্ছেন কমিটির সভাপতি। ছেলে প্রবাসী, প্রচুর টাকার মালিক। মসজিদ উন্নয়নের জন্য তাকেই করা হচ্ছে প্রধান। তারা সত্য আলোচনা করতে নিষেধ করছেন। মুখ বুজে কমিটির গোলামি করে যাচ্ছেন ইমামরা। মসজিদ পরিচালনার দায়িত্ব পালনকারী কর্তৃপক্ষ বা কমিটির মাধ্যমে ইমাম নিয়োগ দেওয়া হয়। ফলে ইমামতির দায়িত্বটি অনেকটা কমিটির কর্তা ব্যক্তিদের ইচ্ছা-অনিচ্ছার সাথে সামঞ্জস্য রেখে পরিচালিত হয়।
ইমাম সাহেবদের এসকল কথা অবশ্যই সত্য, যা বর্তমান সমাজের বাস্তব চিত্র। আমাদের সকলের একটি সামাজিক দায়িত্ববোধ আছে। এই যদি হয় আমাদের নৈতিকতার অবস্থা তাহলে আর কবে আমরা সজাগ হবো আর কবে আমরা একটি সুন্দর সমাজ উপহার পাব। সময় পাল্টেছে যুগের সহিত তাল মিলিয়ে, তবে আমরা কেন পাল্টাবোনা। একটি সমাজে অনেকগুলো মানুষের বসবাস, আমরা ইচ্ছা করলেই সবাই য়ৌথভাবে সত্যতা আর ন্যায় প্রতিষ্টার লক্ষ্য একটি সুস্থ সমাজ গড়ার জন্য, গঠন করতে পারি একটি সৎ ও সত্যবান মসজিদ কমিটি এবং পাশাপাশি ইমাম সাহেবকে দিতে হবে তাদের কথা বলার স্বাধীনতা, মুক্ত করতে হবে তাদেরকে মসজিদ কমিটির যাতাকল থেকে। তাই আমাদের উচিৎ একজন যোগ্য ইমামের সহিত একটি সৎ ও সত্যবান মসজিদ কমিটি গঠন করা, পাশাপাশি বর্তমান সামাজের আয় ব্যায়ের হিসাবের সহিত সামন্জ্যস্য রেখে ইমামের বেতন প্রদান করা এবং তাদেরকে সকল প্রকার সুযোগ সুবিধা দেওয়া। একজন যোগ্য ইমাম আজকের সমাজের অনাচার, অবিচার, জুলুম, নির্যাতনসহ নানা অনাচার বিরাজ করছে তার বিরুদ্ধে মসজিদে খুৎবার পাশাপাশি সকল প্রকার আলোচনা ও মাহফিলে ইসলামের দৃষ্টিভঙ্গি তুলে ধরে, মানুষের মধ্যে সচেতনতা বৃদ্ধির লক্ষ্য কাজ করবেন বলে বাংলাদেশের সকল মুসলমান প্রত্যাশা করে।
লেখক: নিয়ামুল হক (এডভোকেট)
০১৭১৭-৪৯০৮৮০

10