১৯৯৬ সালের এ দিনে রহস্যময় মৃত্যুতে না ফেরার দেশে চলে যান সালমান শাহ

91

সালমান শাহ। বাংলা চলচ্চিত্রের আকাশে ক্ষণজন্মা এক নক্ষত্রের নাম। নব্বই দশকে বাংলা চলচ্চিত্রে ধূমকেতুর মতো আবির্ভাব হয়েছিল তার। চলচ্চিত্র ক্যারিয়ারে খুব অল্প সময়ে অসংখ্য ভক্তের হূদয়ে জায়গা পেয়েছিলেন এই চিত্রনায়ক। ভক্তরা ভালোবেসে তাকে ‘অমর নায়ক’ উপাধি দিয়েছিলেন। ১৯৯৬ সালের আজকের এ দিনে রহস্যময় মৃত্যুতে না ফেরার দেশে চলে যান সালমান শাহ। প্রয়াত এ নায়কের স্মরণে দৈনিক আমার সংবাদের বিশেষ আয়োজন—

সালমানের যত ছবি

কেয়ামত থেকে কেয়ামত (২৫ মার্চ ১৯৯৩), তুমি আমার (২২ মে ১৯৯৪), অন্তরে অন্তরে (১০ জুন ১৯৯৪), সুজন সখী (১২ আগস্ট ১৯৯৪), বিক্ষোভ (৯ সেপ্টেম্বর ১৯৯৪), স্নেহ (১৬ সেপ্টেম্বর ১৯৯৪), প্রেমযুদ্ধ (২৩ ডিসেম্বর ১৯৯৫), কন্যাদান (৩ মার্চ ১৯৯৫), দেনমোহর (৩ মার্চ ১৯৯৫), স্বপ্নের ঠিকানা (১১ মে ১৯৯৫), আঞ্জুমান (১৮ আগস্ট ১৯৯৫), মহামিলন (২২ সেপ্টেম্বর ১৯৯৫), আশা ভালোবাসা (১ ডিসেম্বর ১৯৯৫), বিচার হবে (২১ ফেব্রুয়ারি ১৯৯৬), এই ঘর এই সংসার (৫ এপ্রিল ১৯৯৬), প্রিয়জন (১৪ জুন ১৯৯৬), তোমাকে চাই (২১ জুন ১৯৯৬), স্বপ্নের পৃথিবী (১২ জুলাই ১৯৯৬), সত্যের মৃত্যু নাই (৪ অক্টোবর ১৯৯৬), জীবন সংসার (১৮ অক্টোবর ১৯৯৬), মায়ের অধিকার (৬ ডিসেম্বর ১৯৯৬), চাওয়া থেকে পাওয়া (২০ ডিসেম্বর ১৯৯৬), প্রেম পিয়াসী (১৮ এপ্রিল ১৯৯৭), স্বপ্নের নায়ক (৪ জুলাই ১৯৯৭), শুধু তুমি (১৮ জুলাই ১৯৯৭), আনন্দ অশ্রু (১ আগস্ট ১৯৯৭), বুকের ভেতর আগুন (৫ সেপ্টেম্বর ১৯৯৭)

সেরা পাঁচ ছবি
কেয়ামত থেকে কেয়ামত : সোহানুর রহমান সোহান পরিচালিত এ ছবিটি মুক্তি পায় ১৯৯৩ সালের ঈদুল ফিতরে। এ ছবিতে অভিনয়ের মাধ্যমে আত্মপ্রকাশ করে সালমান-মৌসুমী জুটি। ছবিটি ছিল আমির খান-জুহি চাওলা অভিনীত ‘কেয়ামত ছে কেয়ামত’ ছবির রিমেক।
অন্তরে অন্তরে : সালমান-মৌসুমী জুটির দ্বিতীয় ছবি ‘অন্তরে অন্তরে’। মুক্তির পর সুপারহিট হয়েছিল ছবিটি। এ ছবিটি নির্মাণ করেছেন শিবলী সাদিক। এ ছবিতে সালমান-মৌসুমী জুটিকে দেখতে হলে হুমড়ি খেয়ে পড়েছিল দর্শক। ছবিটি সারাদেশে মুক্তি পেয়েছিল ১৯৯৪ সালের ১০ জুন।
তুমি আমার : শাবনূরে বিপরীতে এ ছবিতে অভিনয় করেছিলেন সালমান শাহ। ছবিটি নির্মাণ করেছিলেন জহিরুল হক। ছবিটি মুক্তি পেয়েছিল ১৯৯৪ সালের ২২ মে। সালমান শাহর ক্যারিয়ারের অন্যতম সফল ছবি এটি। মুক্তি পর এ ছবিটিও সুপারহিট হয়েছিল।
বিক্ষোভ : এটি ছিল সালমান শাহর প্রথম অ্যাকশন রোমান্টিক ছবি। ৯ সেপ্টেম্বর ১৯৯৪ সালে মুক্তিপ্রাপ্ত এ ছবিটি পরিচালনা করেছেন মহম্মদ হান্নান। এ ছবিতেও জুটিবদ্ধ হয়েছিলেন সালমান-শাবনূর। এ ছবিতে অনিক চরিত্রে অভিনয় করেছিলেন সালমান শাহ।
দেনমোহর : সালমান-মৌসুমী জুটিকে নিয়ে এ ছবিটি নির্মাণ করেছিলেন শফি বিক্রমপুরী। ১৯৯৫ সালের ঈদুল ফিতরে মুক্তি পেয়েছিল ছবিটি। সালমান-মৌসুমী জুটির চারটি ছবির মধ্যে অন্যতম এ ছবিটি।

ভক্তদের দাবি
অসংখ্য ভক্তের প্রিয় নায়ক সালমান শাহ আজ নেই, আছে তার কাজ। আরও আছে তার অভিনীত ছবি, সহকর্মী এবং প্রিয় ইন্ডাস্ট্রি। চলচ্চিত্র সংশ্লিষ্টরা মনে করেন, সালমান শাহকে স্মরণীয় করে রাখার জন্য উদ্যোগ গ্রহণ আজ সময়ের দাবি। সালমান শাহ ভক্তদের দীর্ঘদিনের চাওয়া বাংলা চলচ্চিত্রপ্রেমীদের অন্তরে ঝড় তোলা এই অভিনেতাকে চিরস্মরণীয় করে রাখা হোক বাংলাদেশ চলচ্চিত্র উন্নয়ন কর্পোরেশনের (বিএফডিসি) অভ্যন্তরে অবস্থিত জহির রায়হান কালার ল্যাব, মুক্তিযোদ্ধা জসিম ফ্লোর, মান্না ডিজিটাল কমপ্লেক্স ইত্যাদির মতো করেই।

সালমানের বিপরীতে তারা
চলচ্চিত্র ক্যারিয়ারে ২৭টি ছবিতে অভিনয় করেছেন সালমান শাহ। ওই ছবিগুলোতে তার বিপরীতে অভিনয় করেছেন ৮ জন নায়িকা। সালমান শাহর ক্যারিয়ারের প্রথম নায়িকা মৌসুমী। তার সঙ্গে জুটিবদ্ধ হয়ে সালমান অভিনয় করেছেন চারটি ছবিতে। ছবিগুলো হলো— ‘কেয়ামত থেকে কেয়ামত’, ‘স্নেহ’, ‘অন্তরে অন্তরে’, ‘দেনমোহর’। তারপর সালমান শাহর সঙ্গে জুটি গড়েন শাবনূর। একে একে চৌদ্দটি ছবি উপহার দিয়েছেন তারা। এ জুটির উল্লেখযোগ্য ছবিগুলো হলো— ‘স্বপ্নের পৃথিবী’, ‘জীবন সংসার’, ‘আনন্দ অশ্রু’, ‘তুমি আমার’, ‘সুজন সখি’, ‘স্বপ্নের ঠিকানা’, ‘মহামিলন’, ‘তোমাকে চাই’ ইত্যাদি। সালমান শাহর বিপরীতে বিভিন্ন ছবিতে অভিনয় করেছেন ‘প্রেম যুদ্ধ’, ‘কন্যাদান’ এবং আরো একটি ছবিতে অভিনয় করেছিলেন চিত্রনায়িকা লিমা। ‘আঞ্জুমান’, ‘আশা ভালোবাসা’ ছবিতে সালমানের বিপরীতে ছিলেন শাবনাজ। এছাড়া শাহনাজ, বৃষ্টি, শিল্পী ও শ্যামা সালমানের বিপরীতে অভিনয় করেছেন একটি করে ছবিতে।

১৯৯৫ সালে তোলা ছবি। স্ত্রী সামিরাকে নিয়ে মুম্বাই বেড়াতে গিয়েছিলেন সালমান শাহ। ফিল্ম পাড়ায় শুটিং দেখতে গিয়ে দেখা হয় বলিউড বাদশা শাহরুখ খানের সঙ্গে। শুটিং শেষে হোটেল রুমে দীর্ঘ সময় আলাপ করেন সালমান ও শাহরুখ। এ সময় সালমান ও শাহরুখের স্ত্রীও উপস্থিত ছিলেন। আড্ডার ফাঁকে ফ্রেমবন্দি হয়েছেন সালমান, সামিরা, শাহরুখ এবং গৌরি।

এক নজরে সালমান শাহ
১৯৭১ সালে ১৯ সেপ্টেম্বর সিলেটের জকিগঞ্জ উপজেলায় জন্মগ্রহণ করেন সালমান শাহ। তার প্রকৃত নাম শাহরিয়ার চৌধুরী ইমন। কমর উদ্দিন চৌধুরী ও নীলা চৌধুরী দম্পতির বড় ছেলে তিনি।
খুলনায় বয়রা মডেল হাইস্কুল থেকে শুরু হয় সালমানের শিক্ষাজীবন। ওই স্কুলে চিত্রনায়িকা মৌসুমীর ছিলেন তার সহপাঠী। ১৯৮৭ সালে ধানমন্ডির আরব মিশন স্কুল থেকে মাধ্যমিক পাস করেন তিনি। আদমজী ক্যান্টনমেন্ট কলেজ থেকে উচ্চ মাধ্যমিক সম্পন্ন করে ধানমন্ডির মালেকা সায়েন্স কলেজ থেকে বি.কম পাস করেন এ চিত্রনায়ক।
১৯৮৫ সালে বাংলাদেশ টেলিভিশনের ‘আকাশ ছোঁয়া’ নাটকে অভিনয়ের মধ্য দিয়ে শুরু হয় তার অভিনয় ক্যারিয়ার। এরপর ‘দেয়াল’, ‘সব পাখি ঘরে ফিরে’, ‘সৈকতে সারস’, ‘নয়ন’, ‘স্বপ্নের পৃথিবী’ ইত্যাদি নাটকে অভিনয় করেছেন তিনি। ১৯৯০ সালে মঈনুল আহসান সাবের রচিত উপন্যাস অবলম্বনে নির্মিত ‘পাথর সময়’ এবং ১৯৯৪ সালে ‘ইতিকথা’ ধারাবাহিক নাটকে অভিনয় করেছেন বলেও খোঁজ পাওয়া গেছে।
১৯৯২ সালের ১২ আগস্ট সামিরা হককে বিয়ে করেন সালমান শাহ। ফ্যাশন সচেতন সামিরা হক সালমানের দুটি ছবিতে তার পোশাক পরিকল্পনাকারী হিসেবেও কাজ করেছিলেন।
১৯৯৩ সালে প্রখ্যাত চলচ্চিত্র পরিচালক সোহানুর রহমান সোহানের ‘কেয়ামত থেকে কেয়ামত’ ছবিতে অভিনয়ের মাধ্যমে রুপালি পর্দায় অভিষেক ঘটে সালমান শাহর। ওই ছবিতে ‘রাজ’ ছবিতে অভিনয় করেছিলেন সালমান শাহ। ছবিতে তার বিপরীতে ছিলেন মৌসুমী। ‘কেয়ামত থেকে কেয়ামত’ ছবির চিত্রায়ণ চলাকালেই তার নাম পরিবর্তন করে ইমন থেকে সালমান শাহ করা হয়।

প্রথম ছবি মুক্তির পর মাত্র চার বছর রাজত্ব করেছিলেন সালমান শাহ। আর এই চার বছরে ব্যবসাসফল ২৭টি ছবি উপহার দিয়েছিলেন তিনি। শুধু নায়কই নয়, মডেল ও গায়ক হিসেবেও পরিচিত ছিলেন সালমান শাহ। কিশোর বয়সে বন্ধুমহলে তাকে কণ্ঠশিল্পী হিসেবেই চিনত। ১৯৮৬ সালে ছায়ানট থেকে পল্লিগীতিতে উত্তীর্ণও হয়েছিলেন তিনি।

চলচ্চিত্র ক্যারিয়ারে সালমানের সাফল্যে যখন আরও ঊর্ধ্বমুখী হতে থাকে ঠিক তখনই হঠাৎ শোনা যায় তার মৃত্যুর খবর। ১৯৯৬ সালের ৬ সেপ্টেম্বর মাত্র ২৫ বছর বয়সে না ফেরার দেশে চলে যান এ জনপ্রিয় নায়ক। রাজধানী ঢাকার ইস্কাটনে তার নিজ বাসায় সিলিং ফ্যানের সঙ্গে ঝুলন্ত অবস্থায় তার লাশ উদ্ধার করে পুলিশ। জনপ্রিয় এ নায়কের মৃত্যু নিয়ে রহস্য এখনো কাটেনি।

১৯৯৫ সালে তোলা ছবি। স্ত্রী সামিরাকে নিয়ে মুম্বাই বেড়াতে গিয়েছিলেন সালমান শাহ। ফিল্ম পাড়ায় শুটিং দেখতে গিয়ে দেখা হয় বলিউড বাদশা শাহরুখ খানের সঙ্গে। শুটিং শেষে হোটেল রুমে দীর্ঘ সময় আলাপ করেন সালমান ও শাহরুখ। এ সময় সালমান ও শাহরুখের স্ত্রীও উপস্থিত ছিলেন। আড্ডার ফাঁকে ফ্রেমবন্দি হয়েছেন সালমান, সামিরা, শাহরুখ এবং গৌরি।

সালমান শাহ আমাকে পিচ্চি বলে ডাকতো : শাবনূর
সালমান শাহ আমাকে পিচ্চি বলে ডাকতো। শুটিংয়ের ফাঁকে আমরা দুজনই দুষ্টুমি করতাম। একদিন আমার ভীষণ মন খারাপ ছিলো। মন খারাপ করে সেটে বসেছিলাম। সালমান এসে জানতে চাইলো— কী হয়েছে? আমি কৌশলে বিষয়টি এড়িয়ে গেলাম। কিন্তু সালমান ঠিকই বুঝতে পারলো। তারপর সে শুরু করলে খুনসুটি। আমাকে নানা ধরনের গল্প আর এমনভাবে অঙ্গভঙ্গি করেছে, যা দেখে না হেসে পারলাম না। এখনো মন খারাপ হলে সালমানের কথা মনে পড়ে। এই বুঝি ও এসে মনটা ভালো করে দেবে।