কুলাউড়ায় স্কুলছাত্রীর হার্ট অ্যাটাকে মৃত্যু নিয়ে তোলপাড়

1,362

মৌলভীবাজার২৪ ডেস্ক: মৌলভীবাজারের কুলাউড়ায় কুলসুমা বেগম তাসলিমা (১৭) নামে এক স্কুলছাত্রীর মৃত্যুকে কেন্দ্র করে গত ৭দিন থেকে তোলপাড় চলছে।

স্থানীয় লোকজন জানান, গত ৪ জুলাই বৃহস্পতিবার সকাল আনুমানিক ১১টায় স্কুলের ইউনিফর্ম পরিহিত ও স্কুলব্যাগসহ তাসলিমা বরমচাল রেলস্টেশন সংলগ্ন কালামিয়ার বাজারের একটি বাসায় প্রেমিক নওমুসলিম আবদুল আজিজের (মুসলিম হওয়ার আগের নাম লিটন দাস) সঙ্গে দেখা করতে যায়। বিষয়টি বাজারবাসীর সন্দেহ হলে গ্রামপুলিশ কয়ছর মিয়াসহ ব্যবসায়ীরা ওই বাসায় যান। বাসায় গিয়ে ওই স্কুলছাত্রীর পরিচয় নিশ্চিত করার পর ব্যবসায়ীরা গ্রামপুলিশ কয়ছর মিয়াকে দিয়ে তাসলিমাকে মহলাল (রফিনগর) গ্রামের বাড়িতে পাঠিয়ে দেন।

স্থানীয় লোকজনের দাবি, লাশের ময়নাতদন্ত ছাড়া এবং পুলিশকে অবহিত না করে তাসলিমার লাশ দাফন করা হয়।

এদিকে তাসলিমার লাশ দেখা নারীরা নাম প্রকাশ না করার শর্তে জানান, তাসলিমার গালে একটা আচড় এবং গলায় আঙুল দেবে যাওয়ার চিহ্ন সুস্পষ্ট ছিল। লাশের ময়নাতদন্ত হলে শ্বাসরুদ্ধ হয়ে তাসলিমার মৃত্যুর বিষয়টি নিশ্চিত হবে বলে ওই নারীরা জানান।

নওমুসলিম আবদুল আজিজের সঙ্গে দেখা করা প্রসঙ্গে তিনি জানান, তিনি পেশায় কাঠমিস্ত্রী। কাজের সুবাদে তাসলিমাদের বাড়িতে যাতায়াত এবং ঘনিষ্টতা। সেই সুবাদে গত ২ বছর থেকে তাসলিমার সঙ্গে তার প্রেমের সম্পর্ক গড়ে ওঠে। ধীরে ধীরে আবদুল আজিজের সঙ্গে তাসলিমাদের পরিবারের সদস্যদের সখ্যতা গড়ে ওঠে। তাসলিমার প্রেমে পড়ে আবদুল আজিজ ৬ মাস আগে হিন্দুধর্ম ত্যাগ করে মুসলমান হন।

তাসলিমার মা মারা যাওয়ার আগে ৪দিন তার সঙ্গে সিলেট ওসমানী হাসপাতালে সার্বক্ষণিক ছিলেন।

তাসলিমার বাবা জহুর উদ্দিন স্ত্রীর মৃত্যুর পর দেশে ফিরে হৃদরোগে আক্তান্ত হলে আবদুল আজিজ তাকে হাসপাতালে নিয়ে চিকিৎসা করান। চিকিৎসা ব্যয়ভারও বহন করেন। তার কাছ থেকে ২৫ হাজার টাকা ধার নিয়েছে তাসলিমার পরিবার। তাসলিমার সঙ্গে আবদুল আজিজের সম্পর্কের বিষয়টি জেনে জহুর উদ্দিন দু’জনকে মারপিটও করেন। এরপর থেকে উভয়ের দেখা সাক্ষাৎ কমে যাওয়ায় ঘটনার দিন অর্থাৎ বৃহস্পতিবার তাসলিমা বাজারে আসে আবদুল আজিজের সঙ্গে দেখা করতে।

তাসলিমার মৃত্যুর পর হতাশ আবদুল আজিজ আরও জানান, আমি হিন্দু থেকে মুসলমান হয়েছি তাসলিমার জন্য। তাসলিমার পরিবার খুবই উগ্র। এতে তিনি খুব আতঙ্কে আছেন। তবে তাসলিমার বড়বোন ও হাবিবুর রহমান রাহাতকে পুলিশ জিজ্ঞাসাবাদ করলেই মৃত্যুর আসল রহস্য বেরিয়ে আসবে বলে জানান তিনি।

বরমচাল ইউনিয়নের গ্রামপুলিশ কয়ছর মিয়া জানান, কালামিয়ার বাজারে পাশে আবদুল আজিজের ভাড়াটিয়া বাসায় তাসলিমাকে পাওয়ার পর তার চাচা জয়নাল মিয়াকে ফোন দেই। তিনি তাসলিমাকে বাড়িতে নিয়ে দেয়ার কথা বলেন। আমি তাসলিমাকে বাড়িতে দিয়ে আসি। কিন্তু বিকালে শুনি তাসলিমা স্ট্রোক করে মারা গেছে। এটা কী করে সম্ভব?

বরমচাল কালামিয়া বাজারের সাধারণ সম্পাদক মাছুম আহমদ চৌধুরী বাজারের পাশের বাসা থেকে তাসলিমাকে উদ্ধারে বিষয়টি নিশ্চিত করে বলেন, মেয়েটিকে গ্রামপুলিশ কয়ছর মিয়াকে দিয়ে তার বাড়িতে পাঠিয়েছি।

বরমচাল ইউনিয়নের ৫নং ওয়ার্ড মহলাল এলাকার মেম্বার ফখরুল ইসলাম জানান, ঘটনার দিন তিনি সিলেট ছিলেন। রাতে ফোন দিয়ে তাসলিমার পরিবার মৃত্যুর বিষয়টি তাকে জানায়। পরদিন সকাল ১১টায় তিনি জানাজায় অংশ নেন। পরে লোকমুখে তিনি মৃত্যু নিয়ে নানা কথা জানতে পারেন।

নিহত তাসলিমার বাবা জহুর উদ্দিন জানান, ঘটনার দিন তিনি বাড়িতে ছিলেন না। বাড়িতে ফিরে মেয়েকে অসুস্থ অবস্থায় বৃহস্পতিবার আসরের নামাজের পর ওসমানী হাসপাতালে নিয়ে গেলে একঘণ্টা পর তাসলিমার মৃত্যু হয়। মৃত্যুর ২-৩দিন পর পুলিশ বাড়িতে এসেছিল। বৃহস্পতিবারে কালামিয়ার বাজারে কী ঘটেছে, তা তিনি জানেন না।

এদিকে তাসলিমার মৃত্যুর ঘটনায় এলাকায় গুঞ্জন শুরু হলে ঘটনার সরেজমিনে তদন্তে গেলে, এ বিষয়ে রিপোর্ট না করার জন্য তাসলিমার পরিবারের একাধিক সদস্য মোবাইল ফোনে অনুরোধ জানান।

এ ব্যাপারে কুলাউড়া থানার পরদর্শক (তদন্ত) সঞ্জয় চক্রবর্তী জানান, মৃত্যুর খবর পাওয়ার পর এসআই রফিক ও এসআই বাদল ঘটনাস্থল পরিদর্শন করেছেন। বিষয়টির তদন্ত চলছে। ময়নাতদন্ত রিপোর্ট ছাড়া কোনো সিদ্ধান্ত দেয়া যাবে না। এখন ময়নাতদন্ত করতে হলে আদালতের নির্দেশে এবং একজন ম্যাজিস্ট্রেটের উপস্থিতিতে লাশ উত্তোলন করতে হবে। এখন তদন্তে মৃত্যুর বিষয়টি নিশ্চিত না হয়ে লাশ উত্তোলনের জন্য আদালতের কাছেও আবেদন করা সম্ভব হচ্ছে না।