সুনামগঞ্জে দাদার বাড়ি দেখা হলো না শিশু জায়ানের!

418

সুনামগঞ্জের দিরাই উপজেলার ভাটিপাড়ায় জায়ান চৌধুরীদের আদিবাড়ি। এককালে এলাকায় জমিদারি ছিলো ওই পরিবারের। এখনো জমিদারির চিহ্ন লেগে আছে এলাকায়। গ্রামে আলিশান বাড়ি। যা চৌধুরী বাড়ি নামে পরিচিত।

চলতি বছরেই এসব দেখতে গ্রামের বাড়ি আসার কথা ছিলো জায়ানের। নিজের পৈতৃক ভিটা আর দেখা হলো না এই শিশুর। রোববার শ্রীলঙ্কায় সিরিজ বোমা হামলায় আরও অনেকের সাথে প্রাণ হারায় বাংলাদেশি শিশু জায়ান।

জায়ানের নানা আওয়ামী লীগের প্রবীণ নেতা শেখ সেলিম। আর দাদা দাদা মতিনুল হক চৌধুরী পারুল। আগামী নভেম্বরের শুরুতেই প্রথমবারের মতো পৈতৃক নিবাস দিরাই’র ভাটি পাড়ায় আসার কথা ছিল জায়ানের।

নাতি বাড়ি আসবে, সেই খুশিতে দাদা সপ্তাহখানেক আগে মতিনুল হক চৌধুরী ঢাকা থেকে চলে আসেন গ্রামের বাড়িতে। শুরু করেন বাড়ির সংস্কারকাজ। বাড়ি এসে শ্রমিক লাগিয়ে নতুন করে চৌধুরী নিবাস সংস্কার, পরিস্কার-পরিচ্ছন্ন করা, বিদ্যুত সংযোগ নেওয়ার কাজ শুরু করেন। বাড়িতে নিয়ে এসেছিলেন ফ্রিজ। বিদ্যুৎ ভোগান্তির শংকায় নতুন জেনারেটর কিনেছিলেন। সহ মুল্যবান আসবাবপত্র। গাড়ি যাতে সহজে বাড়িতে আসতে পারে, সে জন্য রাস্তায় নতুন মাটি ভরাট করেন। গ্রামের একে-ওকে নাতির আসার খবরটি দিয়েছেন। কিন্তু রোববার বিকেলে পাওয়া দুঃসংবাদে সব এলোমেলো হয়ে যায়।

বাবা মশিউল হক চৌধুরী প্রিন্স ও মা শেখ আমেনা সুলতানা সোনিয়ার সাথে শ্রীলঙ্কায় বেড়াতে গিয়েছিলো দুই ভাই জায়ান ও জোহান। কে জানতো ওই যাওয়াই শেষ যাওয়া হবে। আর কখনো ফিরা হবে না তার!

প্রিয় নাতির কাছে প্রায়ই নিজেদের গ্রামের বাড়ির গল্প করতেন মতিনুল হক চৌধুরী পাারুলের। গল্প করতেন বিশাল হাওরের। দাদার মুখে গ্রামের বর্ণণা শুনে গ্রামে আসার বায়না ধরেছিলো জায়ান।

কিন্তু নাতিকে নিজেদের আদি বাড়ি দেখানোর বাসনা অধরাই রয়ে গেল রোববারের বোমা হামলায় জায়ান চৌধুরী নিহত হওয়ায়। বোমা হামলায় হতাহতের খবর পেয়ে রোববার সন্ধ্যায় গ্রামের বাড়ি ছেড়ে মতিনুল হক ঢাকার বাসায় ছুটে যান। নাতীর মৃত্যুর খবর শুনে বার বার মুর্চা যাচ্ছিলেন তিনি।

মতিনুল হক চৌধুরীর ভাতিজা সুজাত বখত চৌধুরী বলেন, সম্পর্কে উনি আমার চাচা হলেও আমরা ছিলাম সমবয়সী। তিনি (মতিনুল হক) ঢাকা থেকে গ্রামের বাড়ি দিরাই আসার সময় আমাকে সাথে নিয়ে এসেছিলেন। গল্প করেছেন উনার নাতী আদরের জায়ান চৌধুরী গ্রামের বাড়ি আসবে আগামী নভেম্বরে। তাই গ্রামের বাড়ি নতুন করে সাজানো, সংস্কার কাজে তিনি গত এক সপ্তাহ ধরে করাচ্ছিলেন।

সুজাত চৌধুরী আরও বলেস, রবিবার বিকেলেও আমি আর চাচা এক সাথেই ছিলাম, হঠাৎ করেই শ্রীলঙ্কায় দুর্ঘটনায় নাতি ও ছেলের আহত হবার খবর আসে। এতে হাসোজ্জ্বোল মানুষটির একেবারে মুষড়ে পড়েন। তড়িগড়ি করেই ঢাকায় বাসায় ফিরেন। ঢাকার বাসায় পৌছলেও সেখানেও তিনি প্রিয় নাতরি জন্য বিলাপ করে বার বার সোমবার মুর্চা যাচ্ছেন।

ওই বাড়িতে গিয়ে কথা মতিনুল হক চৌধুরীর চাচাতো ভাই বৃদ্ধ আবু নোমান চৌধুরীর সঙ্গে। জায়ানের প্রসঙ্গ তুলতেই কেঁদে ফেলেন। তিনি বলেন, ‘বড় ভালো ছেলে ছিল জায়ান।’

আবু নোমান চৌধুরী বলেন, এবার মা-বাবাকে নিয়ে জায়ান গ্রামে আসতে চাইছিলো। সেই সঙ্গে তার নানা শেখ সেলিম সাহেবেরও আসার কথা ছিল।

তিনি বলেন, ‘জায়ান এভাবে আমাদের ছেড়ে চলে গেল, এটা ভাবতে কষ্ট হচ্ছে। তারা কেন আমার নিষ্পাপ নাতিকে মারল। তার কী দোষ ছিল।’

প্রসঙ্গত, শ্রীলঙ্কায় বর্বরোচিত সিরিজ বোমা হামলায় নিহত শেখ সেলিমের নাতী ছোট্র জায়ান চৌধুরী (৮)র পৈতৃক বাড়ি সুনামগঞ্জের বনেদী জমিদার পরিবারে।

গ্রামের বাড়িতে না ফিরলেও আজ ঠিকই দেশে ফিরবে জায়ান চৌধুরী। তবে ফিরবে লাশ হয়ে, কফিনবন্দি হয়ে।

প্রসঙ্গত গত রবিবার ইষ্টার সানডে পালনকালে শ্রীলঙ্কার রাজধানী কলম্বোর কয়েকটি গীর্জা ও হোটেল সহ আটস্থানে সিরিজ বোমা হামলায় নিহত হন তিন শতাধিক ব্যক্তি। নিহতদের মধ্যে জায়ান চৌধুরীও রয়েছে। এই হামলায় জায়ানের বাবা মশিউল হক চৌধুরী প্রিন্সও গুরুতর আহত হয়েছেন। তিনি শ্রীলঙ্কার একটি হাসপাতালে চিকিৎসাধীন আছেন।

এদিকে শেখ সেলিমের ব্যক্তিগত সহকারি ইমরুল হক গণমাধ্যকে জানান, বুধবার বাবাকে ছাড়াই দেশে আনা হচ্ছে শিশু জায়ানের মরদেহ। শেখ সেলিমের জামাতা মশিউল হক চৌধুরী প্রিন্সের পায়ের জখম গুরুতর হওয়ায় তাকে এখনই দেশে ফিরিয়ে আনা সম্ভব নয়।