নুসরাতের বক্তব্যেই সত্য লুকিয়ে ছিল

65

সংকটাপন্ন অবস্থায় নুসরাতের দেওয়া বক্তব্য এবং এ ঘটনায় দায়ের করা মামলার এজাহারের মধ্যেই প্রকৃত সত্য লুকিয়ে ছিল। মামলাটি পুলিশ ব্যুরো অব ইনভেস্টিগেশনের (পিবিআই) কাছে ন্যস্ত হওয়ার পরপরই এজাহার এনে বিশ্নেষণ করা হয়। এজাহারে দায়ের বক্তব্যটি গ্রহণযোগ্য বলে মনে হয়েছে। এরই মধ্যে নুসরাতের একটি বয়ান তার ভাইয়ের মাধ্যমে গণমাধ্যমে চলে আসে। জীবন-মৃত্যুর সন্ধিক্ষণে থাকাকালীন নুসরাতের ওই বক্তব্যের সঙ্গে এজাহারের ভাষ্যের মিল ছিল। একটি মেয়ে এ রকম পরিস্থিতিতে একটি কথা বলছে, এটা অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ। এরই মধ্যে নুসরাতের ভাষ্য ও এজাহারের সূত্র ধরে বিভিন্ন উইংকে কাজে লাগিয়ে তদন্ত শুরু করে পিবিআই। দ্রুত সন্দেহভাজনদের গ্রেফতারের অভিযানে সক্রিয় হওয়ার সিদ্ধান্ত হয়। একে একে বেরিয়ে আসতে থাকে নুসরাত হত্যার নানা দিক। তবে নুর উদ্দিনই প্রথম মুখ খুলেছিল। তার আগে আরও কয়েকজনকে গ্রেফতার করা গেলেও তারা সত্য আড়াল করছিল।’
গতকাল মঙ্গলবার দুপুরে ধানমণ্ডিতে নিজ কার্যালয়ে সমকালকে দেওয়া একান্ত সাক্ষাৎকারে এসব কথা বলেন পিবিআইর প্রধান ডিআইজি বনজ কুমার মজুমদার।
দেশ-বিদেশে চাঞ্চল্য তৈরি করা নুসরাত হত্যাকাণ্ডে জড়িত প্রায় সব অভিযুক্তকে অল্প সময়ের মধ্যে গ্রেফতার করতে সক্ষম হয় পিবিআই। প্রকৃত সত্যকে তদন্তের মাধ্যমে সামনে এনে আসামিদের মুখোশ উন্মোচন করায় অনেকেই সাধুবাদ জানাচ্ছে পুলিশের এই বিশেষায়িত তদন্ত সংস্থাকে। এতে নুসরাত হত্যাকে ঘিরে প্রভাবশালী একটি মহল যে নাটক সাজাতে চেয়েছিল, তাও ভেস্তে যায়। চূড়ান্তভাবে সত্য ও ন্যায় জয়ী হয়।
‘কী কৌশল ব্যবহার করে এত দ্রুত সত্য সামনে আনা সম্ভব হলো?’
বনজ কুমার বলেন, ‘এটা বিশেষ কোনো ম্যাজিক নয়। পিবিআইর কিছু একনিষ্ঠ সদস্য রয়েছে, যাদের হাতে কোনো মামলা গেলেই আসল কাহিনী বের হয়ে আসে। এরই মধ্যে তারা অভিযুক্তদের জিজ্ঞাসাবাদের একটি নিজস্ব স্টাইল বের করেছে। নুসরাত হত্যার ক্ষেত্রে অভিযুক্তদের জিজ্ঞাসাবাদে সেই কৌশল প্রয়োগ করা হয়েছে। প্রথমেই পিবিআই সিদ্ধান্ত নিল- আগে অভিযুক্তদের গ্রেফতার করতে হবে। এরপর তাদের মোবাইল নম্বর, বন্ধুবান্ধবদের নাম-ঠিকানা ও ছবি সংগ্রহ করা হয়। তখনও পিবিআই জানত না গ্রেফতার করলেই রহস্য বেরিয়ে আসবে। নুর উদ্দিনের আগেও কয়েকজনকে গ্রেফতার করা হয়। কিন্তু তারা মুখ খোলেনি। গ্রেফতারের পর পরই নুর উদ্দিন জানায়, সে সব সত্য প্রকাশ করবে। সে মূলত মুখ খোলার ব্যাপারে পিবিআইকে লিড দেয়। এর পরই গ্রেফতার করা হয় শাহাদাত হোসেন শামীমকে। সেও সত্য ফাঁস করে দেওয়ার কথা জানায়। তাদের বক্তব্যের পর পরই সবকিছু ধীরে ধীরে খোলাসা হতে থাকে।’
‘ঘটনার পর জড়িতরা কি দেশ থেকে পালানোর পরিকল্পনা করছিল?’
‘খুনিরা প্রথমে ভেবেছিল ঘটনাটি তারা ধামাচাপা দিতে সক্ষম হবে। ঘটনার পর তারা নিজেদের মধ্যে ফোনে যোগাযোগও রেখেছিল। তবে ১০ এপ্রিল নুসরাত মারা যাওয়ার পর জড়িতরা নিজেদের মধ্যে যোগাযোগ বন্ধ করে দেয়। ওই তারিখের পর বিশেষ করে নুর উদ্দিন ও শামীমের মধ্যে কোনো যোগাযোগ পাওয়া যাচ্ছিল না। প্রযুক্তিগত তদন্তে এটা দেখার পর কিছুটা চিন্তায় পড়ে পিবিআই। তাদের আশঙ্কা ছিল, হয়তো কেউ কেউ দেশের বাইরে চলে যেতেও পারে। কারও আত্মীয়-স্বজন বিদেশে থাকতে পারে। তাদের সঙ্গে যোগাযোগ করে জড়িতরা দ্রুত দেশ ছাড়তে পারে। পরে তদন্তেও দেখা যায়, খুনিদের মধ্যে কেউ কেউ দেশ ছাড়ার পরিকল্পনা করেছিল। মুক্তাগাছা দিয়ে তারা দেশ ছাড়ার ছক কষছিল। তবে সেটা সফল হওয়ার আগেই ধরা পড়ে যায়। জড়িতদের মধ্যে শামীম মুক্তাগাছায় চলেও গিয়েছিল। তাকে গ্রেফতারে এক সিভিল লোক পুলিশকে সহায়তা করে। গ্রেফতারে পিবিআই তাদের সর্বশক্তি নিয়োগ করেছিল। তবে গ্রেফতার করলেই রহস্য বেরিয়ে আসবে, এটা নিয়ে খুব বেশি আশাবাদী ছিলাম না আমরা।’
এক প্রশ্নের জবাবে পিবিআইপ্রধান বলেন, ‘মামলা যেদিন পিবিআইতে এলো, সেদিন থেকে শুধু ফেনী নয়, চট্টগ্রাম, কুমিল্লা, ঢাকা ও সদর দপ্তরের চৌকস দল সমন্বিতভাবে কাজ শুরু করে। পিবিআই সদর দপ্তরের একটি বিশেষ ইন্টেলিজেন্স ল্যাব রয়েছে, তারা তাদের সক্ষমতার সবটুকু ব্যবহার করে।’
বনজ কুমার মজুমদার বলেন, ‘তদন্তের বেশ কিছু অগ্রগতির পর মনে হয়েছিল, দেশবাসীকে কিছু জানানো দরকার। তারা তো এ ঘটনায় ভীষণ কষ্ট পেয়েছেন। তাই শনিবার গণমাধ্যম কর্মীদের তদন্তের অগ্রগতি সম্পর্কে জানানো হয়। পরের দিন নববর্ষ। দুই আসামি জানাল, তারা ১৬৪ ধারায় আদালতে স্বীকারোক্তি দেবে। ফেনীর জুডিসিয়াল ম্যাজিস্ট্রেটের কাছে কৃতজ্ঞতা যে, বন্ধের দিন জবানবন্দি গ্রহণ করেছেন তিনি।’
পিবিআইপ্রধান বলেন, ‘এ সংস্থার কিছু চৌকস কর্মকর্তা রয়েছে। নুসরাত হত্যায় জড়িতদের সারারাত জিজ্ঞাসাবাদ করেছে। জিজ্ঞাসাবাদের একপর্যায়ে দুর্বল হয় তারা। এরই মধ্যে দু’জন ৫৫ পৃষ্ঠার স্বীকারোক্তি দিয়েছে। এখন পর্যন্ত এ হত্যায় বিভিন্ন পর্যায়ে ১৫ জনের সংশ্নিষ্টতা পাওয়া গেছে। এখন তদন্ত এগিয়ে নিতে হবে।’
বনজ কুমার মজুমদার বলেন, ‘প্রধানমন্ত্রী ঘোষণা দিয়েছেন, নুসরাত হত্যায় জড়িত খুনিরা রেহাই পাবে না। আমরাও চেয়েছি কত দ্রুত এর রহস্য উন্মোচন করা যায়। শ্রম ও মেধার প্রয়োগ ঘটিয়ে নির্ভুলভাবে তদন্ত শেষ করাই এখন চ্যালেঞ্জ। এ মামলায় অপরাধী যতই ক্ষমতাধর হোক, কোনোভাবে আমরা কাউকে ক্ষমা করব না। তারা কেউ ছাড় পাবে না।’
‘এ হত্যা মিশনে অর্থ ব্যয় করেছেন কারা?’
‘মামলার তদন্তে টাকার বিষয়টি এসেছে। কয়েকজনের নাম এসেছে। আসলে ওই মাদ্রাসায় অর্থের একটি ব্যাপার ছিল, এটা তদন্তে উঠে আসছে। হত্যার চূড়ান্ত ছক করা হয় ৪ এপ্রিল। যে দোকান থেকে বোরকা ও কেরোসিন কেনা হয়েছে, তার খোঁজ পাওয়া যাচ্ছে। বোরকা বাসা থেকে নিয়ে আসা হয়েছিল কি-না, তা নিশ্চিতভাবে জানার চেষ্টা চলছে। এসব তথ্য আরও নিবিড়ভাবে যাচাই-বাছাই চলছে।’
মামলার এজাহারের ত্রুটির ব্যাপারে পিবিআইপ্রধান বলেন, ‘যে এজাহার পিবিআইর হাতে এসেছে সেটা পরিপূর্ণ এজাহার ছিল। প্রথম কী এজাহার দাখিল করা হয়েছিল, সেটা জানা নেই। পিবিআইর প্রতি জনগণের যে প্রত্যাশা ছিল, সেটা যে পূরণ করা সম্ভব হয়েছে, এটা আশার কথা। যে চ্যালেঞ্জ নিয়ে তদন্ত শুরু হয়েছিল, সেটা প্রায় সম্পন্ন করতে পারাটা ভালো লাগার বিষয়। জনগণও এ ক্ষেত্রে পাশে ছিল। তারা আস্থা হারায়নি।’
‘অনেকে ঘটনাটি আত্মহত্যা বলে চালিয়ে দেওয়ার অপচেষ্টা করছিল। কেন আপনার কাছে ঘটনাটি আত্মহত্যা বলে মনে হয়নি?’
বনজ কুমারের স্পষ্ট কথা, আমার কাছে কখনও মনে হয়নি নুসরাতের ঘটনাটি আত্মহত্যা। ৭ এপ্রিল রাতে দেশের বাইরে থেকে এসেছি। ৮ এপ্রিল সকালে অফিসে এসেই দেখি এ খবর। তখনই পিবিআইর সদস্যদের বলি, এ ঘটনার ছায়াতদন্ত শুরু করো। এটার ঘণ্টাখানেক পরই বলা হয়, পিবিআই যেন এ মামলাটি নিয়ে আসে। এটাই ফ্যাক্ট, আত্মহত্যার কোনো ইস্যু নলেজে ছিল না। এরই মধ্যে দু’জন নারী কর্মকর্তাকে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে পাঠানো হয়। তারা জানাচ্ছিলেন, মেয়েটি সংকটাপন্ন অবস্থায় শুধু ‘ওস্তাদ’ শব্দটি বলে। ওস্তাদ আসলে মাদ্রাসার অধ্যক্ষ। মামলার তদন্তে যখন ঢুকে পড়েছি, তখন বিভিন্নজন জানতে চায়, ঘটনাটি আত্মহত্যা কি-না। ততক্ষণে নিশ্চিত হয়েছি এটা পরিকল্পিত হত্যাকাণ্ড। মানুষ চায় এ মামলার দ্রুত চার্জশিট হোক। তবে সমস্যা হলো সবাই তো আর স্বীকারোক্তি দেবে না। অন্যদের সাক্ষ্য-প্রমাণের ভিত্তিতে তদন্ত এগিয়ে নিয়ে দোষীদের দৃষ্টান্তমূলক সাজা নিশ্চিত করতে হবে। সেটা নির্ভুলভাবে সততা ও পেশাদারিত্বের সঙ্গে করে যৌক্তিক সময়ের মধ্যে তদন্ত শেষ করা হবে। অহেতুক সময় নেওয়া হবে না, আবার তদন্তে তাড়াহুড়া করে ভুলও করা যাবে না।
সোনাগাজী থানার সাবেক ওসি মোয়াজ্জেম হোসেনের ব্যাপারে তদন্ত প্রতিবেদন দাখিলের দায়িত্ব আদালতের নির্দেশে পিবিআইর ওপর ন্যস্ত হয়। এ ব্যাপারে বনজ কুমার মজুমদার বলেন, সাইবার ক্রাইম ট্রাইব্যুনাল একটি নির্দেশনা দিয়েছেন। স্পেশাল ইন্টেলিজেন্স ইউনিটকে তদন্তের দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে। যৌক্তিক সময়ের মধ্যে তারা তদন্ত প্রতিবেদন দাখিল করবে।