মৌলভীবাজারের দুই কৃতি সন্তান স্বাধীনতা পদক পাচ্ছেন

495

২০১৯ সালের স্বাধীনতা পদক ছিনিয়ে নিলেন মৌলভীবাজারের দুই নক্ষত্র। একজন দেশ বিদেশের প্রখ্যাত অর্থনীতিবিদ, গবেষক, লেখক ও সমাজ সংষ্কারক ড. কাজী খলীকুজ্জামান আহমদ। তিনি স্বাধীনতা পদক পেয়েছেন সমাজসেবা ও জনসেবায় বিশেষ অবদানের জন্য। অপরজন নারী সমাজের অগ্রপথিক, শিশু হৃদরোগ বিশেষজ্ঞ সাহসী রাজকন্যা ব্রিগেডিয়ার জেনারেল নুরুন নাহার ফাতেমা বেগম। তিনি চিকিৎস্যাবিদ্যায় বিশেষ অবদানের জন্য স্বাধীনতা পদক পেলেন। আগামী ২৫ মার্চ বাংলাদেশ সরকারের প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার কাছ থেকে তাঁরা “স্বাধীনতা পুরষ্কার- ২০১৯” গ্রহণ করবেন।

ড. কাজী খলীকুজ্জামানের জীবনের রংতুলি:
বরণ্য অর্থনীতিবিদ, গবেষক, সমাজ ভাবনার অন্যতম ব্যক্তিত্ব কাজী খালিকুজ্জামানের রংতুলির জীবনবাদি আঁচড় ছড়িয়ে ছিটিয়ে আছে দেশ বিদেশের আনাচে কানাচে। তিনি ১৯৪৩ সালের ১২ মার্চ মৌলভীবাজারের রাজনগর উপজেলার পাঁচগাও এলাকার এক বনেদি মুসলিম পরিবারে জন্মগ্রহণ করেন। তার পিতা মরহুম মৌলানা কাজী মুফজ্জল হোসেন ছিলেন একজন তুখোড় রাজনীতিবিদ ও শিক্ষাবিদ। তিনি ১৯৪৬ সালে নির্বাচিত এম এল এ ছিলেন। ড. খলীকুজ্জামানের মাতা বেগম মরহুম ছহিফা খাতুন ছিলেন একজন মহিয়ষী নারী। তদানিন্তন সময়ে শিক্ষা বিস্তারে তিনি ব্যাপক কাজ করে গেছেন।
ড. কাজী খলীকুজ্জামান ৪ ভাই ও ১ বোনের মধ্যে তিনি ছিলেন জৈষ্ঠ সন্তান। শিশুতোষ গল্প শুনে শুনেই বড় হয়েছেন। মা-বাবার কাছ থেকে পুঁথিপাঠ, গাজীর গীত ও নানামুখী শিশুপাঠ্য বই থেকে জ্ঞান অর্জন করেন। সপ্তম শ্রেণি পর্যন্ত তিনি ইসকুলে যাননি। তাঁর ঘর ছিল তার পাঠশালা। অষ্টম শ্রেণিতে গিয়ে ভর্তি হন নিজ এলাকার রাজনগর পোর্টিয়াস উচ্চ বিদ্যালয়ে। সেখান থেকে ১৯৫৬ সালে এসএসসি পাশ করেন। পরবর্তীতে সিলেট এমসি কলেজ থেকে এইচ এস সি পাশ করে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে অর্থনীতিতে সম্মানসহ এম এ ডিগ্রি লাভ করেন। পরে তিনি লন্ডন বিশ্ববিদ্যালয় লন্ডন স্কুল অব ইকনমিক্স এন্ড পলিটিক্যাল সায়েন্স এ অর্থনীতিতে এমফিল এবং ১৯৭৬ সালে পিএইচডি ডিগ্রি অর্জন করেন। পিএইচডি-তে তাঁর গবেষনার বিষয় ছিল The Jute Manufacturing Industry of Bangladesh 1947-74 (PhD Thesis, London University, 1976).

অর্থনীতি ও অর্থনীতি বিষয়ক গবেষনায় কৃতিত্বপূর্ণ অবদানেরর স্বীকৃতিস্বরূপ তিনি অনেক পুরষ্কার লাভ করেছেন। সংবর্ধিত হয়েছেন অগুনিত।
ভাবুক সমাজমনষ্ক অর্থনীতির কবি খলীকুজ্জামানের অন্তর্ভেদি চোখ কৃষি, সাহিত্য, কবিতা, সমাজ উন্নেয়নসহ সকল ভাল কাজে গেঁথেই থাকতো। তিনি এ পর্যন্ত গবেষনা ভিত্তিক ৩০টি বই, ৩০০ শতাধিক গবেষনা রিপোর্ট, প্রবন্ধ, নিবন্ধ ইংরেজি ও বাংলা ভাষায় লিখেছেন। তাঁর গবেষনালব্দ বিষয়গুলো দেশ বিদেশের প্রভাবশালী পত্র-পত্রিকায় প্রকাশিত হয়েছে।
তিনি ১৯৭১ সালে আমাদের “সবুজের মাঝে লাল বৃত্তকে” ছিনিয়ে আনতে মুক্তি সংগ্রামে অংশগ্রহণ করেন। তিনি মুজিবনগর সরকারের অধিনে পরিকল্পনা সেলে কর্মরত ছিলেন। পাকিস্তানী শাসন ও শোষনের বিরুদ্ধে ষাটের দশকে অর্থনীতিবিদ হিসেবে সক্রিয় ভূমিকা রেখেছেন। সাংগঠনিক ক্ষেত্রে তিনি জাতীয় ও আন্তর্জাতিক পর্যায়ে উজ্জ্বল স্বাক্ষর রেখেছেন।
দারিদ্র বিমোচনে তিনি নিরলস কাজ করে যাচ্ছেন। বাংলাদেশের জাতীয় সমস্যা পানির উপর বিভিন্ন ব্যাতিক্রমী গবেষনা পরিচালনায়ও নেতৃত্ব দিচ্ছেন।
পরিবেশের উপর তিনি যুগান্তকারী বিভিন্ন পদক্ষেপ নিয়ে কাজ করে যাচ্ছেন। এ পর্যন্ত তিনি বিভিন্ন সম্মাননায় ভূষিত হয়েছেন। তার মধ্যে উল্লেখযোগ্য, বাংলাদেশ অর্থনীতি সমিতির স্বর্ণপদক-২০১২, সমাজসেবায় একুশে পদক-২০০৯, ২০০৭ সালের শান্তিতে নোবেল পুরষ্কার বিজয়ী ইন্টারগভর্নমেন্ট প্যানেল অব ক্লাইমেট চেঞ্জ এর সদস্য, ২০০৫ সালে মার্কেন্টাইল ব্যাংক পুরষ্কার।
পারিবারিক জীবনে ড. কাজী খলীকুজ্জামান অত্যন্ত সফল ও সূখি জীবনযাপন করছেন। তাঁর স্ত্রী ড. জাহেদা আহমদ ঢাকা বিশ^বিদ্যালয়ে ইতিহাস বিভাগের অধ্যাপনা করছেন। তিনি লন্ডন বিশ্ববিদ্যালয় থেকে পিএইচডি ডিগ্রি অর্জন করেছেন। ড. জাহেদা বিভিন্ন গবেষনায় জড়িত রয়েছেন। তাঁর লেখার হাত ভারি চমৎকার। তাঁদের দুজন সন্তান রয়েছেন। একজন কাজী রুশদী আহমদ, অপরজন কাজী উরফী আহমদ।

ব্রিগেডিয়ার জেনারেল ডা. নুরুন নাহারের জলছবি:
সাহসী রাজকন্যা ও শিশু হৃদয়ের বিশেষজ্ঞ ব্রিগেডিয়ার জেনারেল ডা. নুরুন নাহার ফাতেমা বেগম ১৯৬২ সালে মৌলভীবাজারের বড়লেখা উপজেলার বর্ণি ইউনিয়নের পাকশাইল গ্রামের এক সম্ভ্রান্ত মুসলিম পরিবারে জন্মগ্রহণ করেন। তাঁর বাবা মরহুম এম এ ওয়াদুদ শুল্ক বিভাগের একজন কর্মকর্তা ছিলেন। মা মরহুম ময়মুন্নেছা খাতুন ছিলেন সুগৃহিনী। ব্রিগেডিয়ার ডা. নুরুন নাহার ফাতেমা বেগমের স্বামী কর্ণেল অবঃ আজহার উদ্দীন আহমদ। ব্রিগেডিয়ার ফাতেমা সিলেট কিশোরীমোহন বালিকা বিদ্যালয় থেকে শিক্ষাজীবন শুরু করেন। ১৯৭৭ সালে ওই স্কুল থেকে এসএসসি ও ১৯৭৯ সালে সিলেট এম সি কলেজ থেকে কৃতিত্বের সাথে এইচ এস সি পাশ করেন।

পরবর্তীতে ভর্তি হন সিলেট এম এ জি ওসমানী মেডিকেল কলেজে। মেধাতালিকায় ২য় স্থান লাভ করে ১৯৮৫ সালে এমবিবিএস পাশ করেন। ৮৭ সালে যোগ দেন বাংলাদেশ সেনাবাহিনীতে। পরে বাংলাদেশ কলেজ অব ফিজিশিয়ান্স এন্ড সার্জন্স থেকে শিশু রোগের উপর এফ সি পি এস ডিগ্রি অর্জন করেন। একসময় তিনি সৌদি আরবের কিং সুলতান হাসপাতালে শিশু হৃদরোগ চিকিৎসায় বিশেষ পারদর্শীতা লাভ করেন। ১৯৯৮ সালে দেশে ফিরে ঢাকা সম্মিলিত সামরিক হাসপাতালে প্রতিষ্ঠা করেন শিশু হৃদরোগ বিভাগ। যা বাংলাদেশে প্রথম শিশু হৃদরোগ চিকিৎসা কেন্দ্র হিসেবে খ্যাতি অর্জন করে।
২০১২ সালের দক্ষিন এশিয়ায় প্রথমবারের মতো তিনি হার্টের পালমোনারি ভাল্ব প্রতিস্থাপন করেন। যা দেশ বিদেশে শিশু হৃদরোগ চিকিৎসায় অনন্য নজির স্থাপন করেছে। একে একে তিনি বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর জন্য বয়ে এনেছেন নানা গৌরব ও সাফল্য।
শিশু হৃদরোগের চিকিৎসায় তিনি নিরলস পরিশ্রম করে, তাঁর মেধা ও মননের প্রতিফলন ঢেলে সাজিয়ে তুলেন শিশুদের হৃদয় বাঁচানোর নানা প্রেক্ষাপট। এ কারণেই তাঁকে বাংলাদেশে “মাদার অব পেডিয়ার্ট্রিক কার্ডিওলজিষ্ট” হিসেবে আখ্যায়িত করা হয়। দেশের শিশু চিকিৎসার আরেক জন্মদাতা মরহুম অধ্যাপক এম আর খাঁনের সাথে প্রতিষ্ঠা করেন চাইল্ড হার্ট ট্রাষ্ট অব বাংলাদেশ। যেখানে গরিব ও প্রান্তিক শিশুদের জন্য বিনামূল্যে চিকিৎসা সেবা দেয়া হয়। এছাড়াও মধ্যপ্রাচ্য ও যুক্তরাজ্যসহ বিভিন্ন দেশের সাথে যৌথ পরিচালনার মাধ্যমে তিনি প্রতিবছর দেশের দুই শতাধিক হতদরিদ্র হৃদরোগ আক্রান্ত শিশুদেরকে বিনামূল্যে চিকিৎসা প্রদান করে আসছেন।
পারিবারিকভাবে তাঁর গ্রামের বাড়ি বর্ণি ইউনিয়নের পাকশাইলে তিনি প্রতিষ্ঠা করেছেন ওয়াদুদ-ময়মুন্নেছা ফাউন্ডেশন। সেখানে শিশুদের জন্য ফ্রি ফ্রাইডে ক্লিনিক, ফ্রি খৎনা প্রদান ও হৃদরোগ সনাক্তকরণসহ বিভিন্ন সেবা প্রদান করা হয়। ব্যক্তিগত জীবনে তিনি রন্তগর্ভা মা হিসেবেও নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করেছেন। তাঁর দুই মেয়ে। বড় মেয়ে মার্জিয়া তাবাসসুম ANZ ব্যাংক এ হেড অব রিস্ক ম্যানেজমেন্ট ইউরোপিয়ান অপারেশন্স হিসেবে কর্মরত রয়েছেন। কনিষ্ট মেয়ে মাইশা আহমদ ফার্মাকোলজিতে উচ্চতর ডিগ্রি নিয়ে যুক্তরাজ্যে চিকিৎসাসাস্ত্রে অধ্যয়নরত।
উল্লেখ্য, ডা. নুরুন নাহার ফাতেমার আরেক বোন কুলাউড়ার সর্বমহলে পরিচিত কুলাউড়া সরকারী কলেজের প্রাক্তন অধ্যাপিকা ফরিদা বেগম (ফরিদা ম্যাডাম)।#